মিসবাহ-উল-হক ,ছবিঃসংগৃহীত।

অভিষেক হলো কোচ মিসবাহর

ঢাকা, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ : ক্রিকেট পাগল দেশ পাকিস্তান। কিন্তু দেশের ভক্ত সমর্থকদের প্রত্যাশা পুরণে বারবারই ব্যর্থ হয়েছে দলটি। তবে ব্যর্থতার গল্প চায় না পাকিস্তান। দেশটির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রিকেটার ইমরান খান এখন ‘নয়া পাকিস্তান’ গড়ার প্রত্যয়ে পরিবর্তন আনতে চান সব ক্ষেত্রে।

নতুন এই ডেউয়ের বাইরে নয় পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডও (পিসিবি)। রাস্ট্রীয় ক্ষমতায় বসার কয়েকদিন পরেই নাজাম শেঠিকে সরিয়ে ওই পিসিবি চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন এহসান মানিকে। ওয়াসিম খানকে নিয়ে আসা হয়েছে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে।

পরিবর্তন এসেছে অভ্যন্তরীন অবকাঠামোতেও। অনেকের বিরোধিতা সত্ত্বেও পরিবর্তন আনা থামানো যায়নি। কিন্তু একাধিক বার চেষ্টা করেও নয়া পাকিস্তানের পথ ধরে একটি জায়গায় খুব বেশী পরিবর্তন আসেনি। সেটি হচ্ছে সাবেক অধিনায়ক মিসবাহ-উল-হককে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ প্রদান। নেতৃত্ব ছাড়ার মাত্র দুই বছরের মধ্যেই জাতীয় ক্রিকেট দলের কোচের দায়িত্ব লাভ করেছেন মিসবাহ। এর আগে একইভাবে পাকিস্তান দলের কোচ নিযুক্ত হয়েছিলেন, ইন্তিখাব আলম, মুস্তাক মোহাম্মদ থেকে ওয়াকার ইউনুস পর্যন্ত। যে কারণে পাকিস্তানের ক্রিকেটে এটি নতুন কোন ঘটনা নয়।

বিশ্বের বহু দেশে অবশ্য এমন ঘটনা ঘটেছে। আর সেই ধারায় প্রথম জাতীয় দলের স্থায়ী কোচ হবার স্বাদ নিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার বব সিম্পসন। বিশ্বব্যাপী এভাবে অধিনায়ক থেকে জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব নেয়া পাঁচ ক্রিকেটারের বর্ননা দেয়া হল।

এন্ডি ফ্লাওয়ার : সাবেক এই জিম্বাবুইয়ান অধিনায়ক তার আমলে বিশ্বসেরা উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ২০০৭ সালে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের সহকারী কোচের দায়িত্ব পান এন্ডি ফ্লাওয়ার। কিন্তু দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যেই ইংলিশদের প্রধান কোচের দায়িত্ব পেয়ে যান তিনি। দলের মধ্যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃস্টি হলে বরখাস্ত হন প্রধান কোচ পিটার মুর। ফলে তার স্থালাভিষিক্ত হন এন্ডি।

এন্ডি ফ্লাওয়ারের অধীনে প্রথম দুই বছরেই দারুন সাফল্য পায় ইংল্যান্ড। এ সময় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মর্যাদাপূর্ণ অ্যাশেজে হোম ও এ্যাওয়য়ে সিরিজ জয় করে ইংলিশরা। এমনকি ক্যারিবীয় অঞ্চলে অনুষ্ঠিত টি-২০ বিশ্বকাপের শিরোপাও জয় করে ইংল্যান্ড। এটি ছিল ক্রিকেটের এই কুলিন দেশটির প্রথমবারের মত আইসিসির কোন ট্রফি জয়।

২০১১ সালে নিজ মাঠে ভারতের বিপক্ষে ৪-০ ব্যবধানে সিরিজ জয়ের মাধ্যমে ইংল্যান্ড পৌঁছে যায় টেস্ট র‌্যাংকিংয়েরও শীর্ষে। ১৮ বছর পর ভারতের ফিরতি সফরেও ইংল্যান্ড সিরিজ জয় করেছিল ২-১ ব্যবধানে। ২০১৩ সালে অ্যাশেজ সিরিজে টানা তৃতীয়বারের মত অস্ট্রেলিয়াকে পরাজিত করেছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু এর ছয় মাসেরও কম সময়ের মধ্যেই অবসান ঘটে এন্ডি ফ্লাওয়ারের ইংল্যান্ড অধ্যায়ের।

জন রাইট: ১৯৮০ এর দশকে নিউজিল্যান্ড জাতীয় ক্রিকেট দলের নেতৃত্ব দেন জন রাইট। যিনি শক্তিশালী ভারতকে নাকানিচুবানি খাওয়ানোর মিশনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ওই সময় ভারতীয় দলের নেতৃত্বে ছিলেন প্রভাবশারী তারকা সৌরভ গাঙ্গুলি। যিনি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে জিতে নিয়েছিলেন ঐতিহাসিক সিরিজ। এরই ধারাবাহিকতা ওয়ানডে সিরিজেও ধরে রেখেছিল সৌরভ বাহিনী।

২০০২ সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে ঐতিহাসিক জয়ে লাভ করে ন্যাট ওয়েস্ট ট্রফি। এক বছর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে ভারত। তবে শেষ পর্যন্ত রানার আপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে সৌরভ বাহিনীকে। ২০০৪ সালে পাকিস্তান সফরে গিয়ে টেস্ট ও ওয়ানডে উভয় সিরিজেই জয়লাভ করে ভারত। এর পরে কিউইদের বিপক্ষে সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেনি ভারত। রাইটের নেতৃত্বে এ্যাওয়ে সিরিজে সফলতা পেলেও পরে আর জাতীয় দলের সঙ্গে চুক্তি বাড়াননি তিনি।

পরে নিউজিল্যান্ডের কোচ হিসেবে দুই বছর দায়িত্ব পালন করেন রাইট। কোচ হিসেবেও দলকে একই পর্যায়ের সফলতা এনে দেন তিনি। তবে তার নেতৃত্বে কিউইদের সেরা সফলতা হচ্ছে ২০১১ সালে বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে পৌঁছানো।

গ্রেগ চ্যাপেল: এদিকে জন রাইটের স্থলাভিষিক্ত কোচ হিসেবে গ্রেগ চ্যাপেল যখন ভারতীয় ক্রিকেট দলের কোচ নিযুক্ত হয়েছিলেন তখন গাঙ্গুলির ফর্ম কিছুটা কমে আসলেও চ্যাপেলের প্রধান লক্ষ্য ছিল গাঙ্গুলিকে দল ছড়া করা। এ সময় ভারতীয় দলের নেতৃত্বভার রাহুল দ্রাবিড়ের উপর বর্তালেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা ছিল চ্যাপেল ও গাঙ্গুলির মধ্যে। চ্যাপেলের কোচের দায়িত্ব পালনকালীন পুরো সময়টা কেটেছে সংকটের মধ্যে। বিষয়টি এতটা প্রকটতা পেয়েছিল যে কোচের বিরুদ্ধে মিছিল হয় কোলকাতার রাস্তায়। একটি গোপন ইমেল বার্তা ফাঁস হওয়ায় দেশটির খোদ সংসদেই সেটি নিয়ে আলোচনা হয়।

এ সময় ময়দানি লড়াইয়ের ফলাফল ছিল মিশ্র। জোহানেসবার্গে টেস্ট জয় এবং টানা ১৭টি ওয়ানডে ম্যাচে জয়লাভ করা ভারত ২০১৭ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে পড়ে। ওই বিশ্বকাপের পরপরই সমাপ্তি ঘটে চ্যাপেল অধ্যায়ের।

অনিল কুম্বলে: অনিল কুম্বলে হচ্ছেন ক্রিকেটের আরেক অধিনায়ক কোচ। কিন্তু তিনি ভারতীয় দলের কোচ নিযুক্ত হবার পর ভারতীয় দলে বিভক্তি চলে আসে। খেলোয়াড়দের শক্তি তীক্ষè হলেও মনোযোগে ঘাটতি দেখা দেয়।

ক্যারিয়ারের শেষভাগে এসে ভারতীয় দলের ১৪টি টেস্টে নেতৃত্ব দিয়েছেন কুম্বলে। এ সময় বিশেষ করে দেশের বাইরে প্রশ্নাতীত সমীহ লাভে সক্ষম হয় ভারতীয় দল। এর পরেই ২০১৬ সালের জুনে ভারতীয় দলের কোচ হিসেবে নিয়োগ পান কুম্বলে। তার অধীনে ভারত প্রত্যেকটি টেস্ট সিরিজে জয়রাভ করেছে। তন্মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এ্যাওয়ে সিরিজ সহ নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হোম সিরিজ রয়েছে। ২০২৭ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হবার পর পদত্যাগ করেন কুম্বলে। এক বছরেরও কম সময়ের জন্য কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন কুম্বলে।

ওয়াকার ইউনুস: কোচের দায়িত্ব পালন করা পাকিস্তানের বেশ কয়েকজন সাবেক অধিনায়কের মধ্যে একজন ওয়াকার ইউনুস।যিনি প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করলেও এখন মিসবাহ’র অধীনে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের বোলিং কোচের দায়িত্ব নিয়েছেন।পাকিস্তানের সাবেক এই পেসার ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দিয়েছেন দলকে। এরপর দুই দফায় পালন করেন প্রধান কোচের দায়িত্ব।

অস্ট্রেলিয়ায় দলের চরম ব্যর্থতার পর ২০১০ সালে প্রথমবারের মত পাকি কোচের দায়িত্ব নেন ইউনুস। এর পরপরই তার দলের খেলোয়াড়দের স্পট ফিক্সিংয়ের খবরে হৈচৈ উঠে ক্রিকেট বিশ্বে। ওই ঘটনাটি মাটি করে দেয় পাকিস্তানের ইংল্যান্ড সফর। তারপরও অবশ্য ২০১১ সালের বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে পৌঁছেছিল পাকিস্তান। ওই আসরে শুধুমাত্র ভারতের কাছে পরাজিত হয়েছিল পাকিস্তান। এক মাস পরেই স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখিয়ে কোচের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন ওয়াকার ইউনুস।

২০১৪ সালে ফের পাকিস্তান দলের কোচের দায়িত্ব পান ইউনুস। শ্রীলংকার কাছে এ্যাওয়ে সিরিজে হার দিয়ে দ্বিতীয় দফার যাত্রা শুরু করেন তিনি। তবে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের মাধ্যমে নিজের কোচিং ক্যারিয়ারের সেরা সময় পার করেছেন ইউনুস। কিন্তু ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের কাছে হেরে পুর্বের অবস্থানে ফিরে যায় পাকিস্তান।

২০১৬ টি-২০ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয়ার পর ফের দায়িত্ব ছাড়েন ওয়াকার।

Social Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *