তামিম ইকবাল -সাকিব আল হাসান ,ছবিঃসংগৃহীত।

জয় দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরলো বাংলাদেশ

অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান ও অভিষিক্ত পেসার হাসান মাহমুদের বোলিং তোপে তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৬ উইকেটে হারিয়েছে স্বাগতিক বাংলাদেশ। করোনার কারনে দীর্ঘ ১০ মাস পর প্রথমবারের মত আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামে বাংলাদেশ জাতীয় দল।

আজ থেকে মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শুরু হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট সিরিজ’-এর তিন ম্যাচের ওয়ানডে লড়াই।

এ ম্যাচে প্রথমে ব্যাট হাতে নামা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১২২ রানে গুটিয়ে দেন সাকিব ও হাসান। সাকিব ৮ রানে ৪টি এবং অভিষেক ম্যাচ খেলতে নামা হাসান ২৮ রানে ৩ উইকেট নেন। জবাবে ৩৩ দশমিক ৫ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ। ম্যাচ সেরা হয়েছেন বাংলাদেশের সাকিব।

বিশ্বকাপ সুপার লিগে নিজেদের প্রথম ম্যাচে জয় তুলে নিয়ে ১০ পয়েন্ট পেল বাংলাদেশ। আর প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমে হারের স্বাদ নিলো সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

প্রথম ওয়ানডেতে টস জিতে প্রথমে বোলিং করতে নামে বাংলাদেশ। ২৪ রানের মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই ওপেনারকে বিদায় দেন বাংলাদেশের বাঁ-হাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমান। নিজের প্রথম ওভারের দ্বিতীয় বলে সফরকারী ওপেনার সুনীল অ্যামব্রিসকে এলবিডবিøউর ফাঁদে ফেলেন মুস্তাফিজ। রিভিউ সিস্টেম নিয়েও বাঁচতে পারেননি ৭ রান করা অ্যামব্রিস।

বৃষ্টির কারনে চতুর্থ ওভারের পর কিছুক্ষণ খেলা বন্ধ ছিলো। পরবর্তীতে মাঠে আবারো বাংলাদেশকে উইকেট শিকারের আনন্দে মাতিয়ে তুলেন মুস্তাফিজ। আরেক ওপেনার জসুয়া ডা সিলভাকে বিদায় করেন তিনি। এই উইকেটের পুরো কৃতিত্ব পেতে পারেন লিটন দাস। গালিতে ডান-দিকে ঝাপিয়ে পড়ে ক্যাচ নেন লিটন। ৯ রান করেন জসুয়া।

দুই ওপেনারকে হারানোয় চাপে পড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজকে খেলায় ফেরানোর চেষ্টা করেন আন্দ্রে ম্যাকার্থি ও অধিনায়ক জেসন মোহাম্মদ। উইকেটে সেট হতে সময় নেন তারা। তাই রানের গতিও ছিলো ধীর। প্রথম ৯ ওভারে ২ উইকেটে ৩৪ রান উঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের।

দশম ওভারে বোলিংএ পরিবর্তন আনেন বাংলাদেশ অধিনায়ক তামিম ইকবাল। এক প্রান্ত দিয়ে অভিষেক ম্যাচ খেলতে নামা হাসান মাহমুদ ও অন্য প্রান্তে সাকিব আল হাসান। নিজের দ্বিতীয় ওভারেই উইকেট পেয়ে যান সাকিব।

৩৪ বলে ১২ রান করা ম্যাকার্থিকে বোল্ড করেন সাকিব। ঘরের মাঠে ১৫০তম উইকেট শিকার করেন সাকিব। জেসনের সাথে ৪৫ বলে ২১ রানের জুটি গড়েন ম্যাকার্থি।

প্রতিপক্ষের অধিনায়ক জেসনকেও দ্রæত বিদায় দেন সাকিব। নিজের চতুর্থ ওভারে উইকেটরক্ষক মুশফিকুর রহিমের স্টাম্পিংএর সহায়তা নিয়ে ক্যারিবীয় অধিনায়ককে ১৭ রানে থামান সাকিব।

পরের ওভারে আবারো ওয়েস্ট ইন্ডিজ শিবিরে আঘাত হানেন সাকিব। রানের খাতা খোলার আগেই এনক্রুমার বোনারকে লেগ বিফোর আউট করেন তিনি। তাই মুস্তাফিজ-সাকিব তোপে ৫৬ রানে ৫ উইকেট হারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

এই অবস্থায় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আরও চেপে ধরার পরিকল্পনায় ছিলো বাংলাদেশ। কিন্তু ষষ্ঠ উইকেটে দারুন এক জুটি গড়েন কাইল মায়ারস ও রোভম্যান পাওয়েল। বাংলাদেশী বোলারদের পাল্টা আক্রমন করেন তারা। এতে রানের চাকা ঘুড়তে থাকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের। মায়ারস ও পাওয়েলের ব্যাটিংএ ২৭তম ওভারে শতরানের স্বাদ নেয় ক্যারিবীয়রা।

প্রথম স্পেলে ৩ ওভারে ১৪ রান দিয়েছিলেন অভিষেক ম্যাচ খেলতে নামা হাসান। দ্বিতীয় স্পেলে আক্রমনে এসে ১০ রান দেন তিনি। তবে হতাশ হননি এই তরুন পেসার। নিজের পঞ্চম ওভারের প্রথম দু’বলে দু’টি উইকেট শিকার করেন হাসান।

পাওয়েলকে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন হাসান। ২টি করে চার ও ছক্কায় ৩১ বলে ২৮ রান করেন পাওয়েল।

মায়ারসের সাথে ষষ্ঠ উইকেটে ৬৩ বলে গুরুত্বপূর্ণ ৫৯ রান যোগ করেন পাওয়েল।

পাওয়েলের বিদায়ে উইকেটে গিয়ে প্রথম বলে হাসানের বলে লেগ বিফোর হন রেমন রেইফার। এতে হ্যাটট্টিকের সুযোগ তৈরি হয়েছিলো হাসানের সামনে। কিন্তু হাসানকে হ্যাটট্টিক বঞ্চিত করেন আলজারি জোসেফ।

১১৫ রানের পাওয়েল-রেইফারের আউটের পর বাকী ৩ উইকেটে বেশি দূর যেতে পারেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। মাত্র ৭ রান যোগ করে ১২২ রানে থামে সফরকারীরা।

উইকেটে সেট হয়ে থাকা মায়ারসকে শিকার করে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দ্রæত গুটিয়ে দেয়া পথ সহজ করে ফেলেন অফ-স্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজ। ৫৬ বলে ৪টি চার ও ১টি ছক্কায় ৪০ রান করেন মায়ারস। এরপর আকিল হোসেনকে ১ রানে হাসান ও জোসেফকে ৪ রানে শিকার করেন সাকিব। আর এতেই ৩২ দশমিক ২ ওভারে শেষ হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস।

৭ দশমিক ২ ওভারে ৮ রানে ৪ উইকেট নেন সাকিব। নিষেধাজ্ঞা শেষে এটিই সাকিবের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ ছিলো।

অভিষেক ম্যাচ খেলতে নামা হাসান ৬ ওভারে ২৮ রানে ৪ উইকেট নেন। ২০ রানে ২ উইকেট শিকার করেন মুস্তাফিজ। ২৯ রানে ১ উইকেট নিয়েছেন মিরাজ।

জয়ের জন্য ১২৩ রানের সহজ লক্ষ্যে খেলতে নেমে দলকে ভালো শুরু এনে দেন বাংলাদেশের দুই ওপেনার তামিম ইকবাল ও লিটন দাস। দেখেশুনে খেলে ১০ ওভারে ৩৯ রান যোগ করেন তারা। এরমধ্যে লিটনের ১১ ও তামিমের ২১ রান ছিলো।

১৪তম ওভারে দলীয় ৪৭ রানে বাংলাদেশের উদ্বোধনী জুটি ভাঙ্গেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাঁ-হাতি স্পিনার আকিল। ৩৮ বলে ২টি চারে ১৪ রান করা লিটনকে বোল্ড করেন আকিল।

লিটনের বিদায়ে উইকেটে তামিমের সঙ্গী হন নাজমুল হোসেন শান্ত। তিন নম্বরে খেলার সুযোগটা কাজে লাগাতে পারেননি শান্ত।

আকিলের দ্বিতীয় শিকার হয়ে মাত্র ১ রান করেন শান্ত। ৯টি বল খেলেছেন শান্ত। ফলে ৫৭ রানে দ্বিতীয় উইকেট হারায় বাংলাদেশ। ১০ রানের ব্যবধানে ২ উইকেট পতনের পর বাংলাদেশকে সামনের দিকে টেনে নিয়ে যান তামিম ও সাকিব।

সাবধনতা অবলম্বন করে স্কোর বোর্ডে রান জড়ো করছিলেন অভিজ্ঞ এই জুটি। জুটিতে ৪১ বলে ২৬ রান যোগ করেন তারা।

ধীরলয়ে খেলতে থাকা তামিমকে আউট করে এই জুটি ভাঙ্গেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক জেসন মোহাম্মদ। ৭টি চারে ৪৪ রান করেন তামিম। বল খেলেছেন ৬৯টি।

তামিমের চেয়ে অতিমাত্রায় ধীর গতির ছিলেন সাকিব। ৪৩ বলে খেলে ১৯ রান করেন তিনি। তার ইনিংসে মাত্র ১টি চার ছিলো।

সাকিবকে আউট করে নিজের তৃতীয় উইকেট তুলে নেন আকিল।

দলীয় ১০৫ রানে চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে সাকিব ফিরে যাবার পর ৯৭ বল বাকী রেখে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করেন মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। ৩৬ বলে অবিচ্ছিন্ন ২০ রান করেন মুশফিক-রিয়াদ। ৩১ বলে ১টি চারে মুশফিক অপরাজিত ১৯ ও রিয়াদ ১৬ বলে ১টি চারে অপরাজিত ৯ রান করেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের আকিল ১০ ওভারে ২৬ রানে ৩টি উইকেট নেন। আকিলসহ এ ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ছয়জনের অভিষেক হয়।

আগামী ২২ জানুয়ারি একই ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হবে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডে।

সংক্ষিপ্ত স্কোর  :
ওয়েস্ট ইন্ডিজ : ১২২/১০, ৩২.২ ওভার (মায়ারস ৪০, পাওয়েল ২৮, সাকিব ৪/৮, হাসান ৩/২৮, মুস্তাফিজ ২/২০)।
বাংলাদেশ : ১২৫/৪, ৩৩.৫ ওভার (তামিম ৪৪, সাকিব ১৯, মুশফিক ১৯*, আকিল ৩/২৬)।

টস-বাংলাদেশ, বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত।
ফল : বাংলাদেশ ৬ উইকেটে জয়ী।
ম্যাচ সেরা : সাকিব আল হাসান (বাংলাদেশ)।
সিরিজ : তিন ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে বাংলাদেশ।

Social Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *