সৌম্য সরকারের ব্যাটিং , ছবিঃ গেটি ইমেজ।

সৌম্যর ব্যাটিং নৈপুণ্যে দুর্দান্ত জয় পেল বাংলাদেশ

দুই ব্যাটসম্যান লিটন দাসসৌম্য সরকারের ব্যাটিং নৈপুন্যে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুর্দান্ত জয় দিয়ে টি-২০ সিরিজ শুরু করলো স্বাগতিক বাংলাদেশ।

আজ সিরিজের প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশ ৪৮ রানে হারিয়েছে জিম্বাবুয়েকে। এই জয়ে দুই ম্যাচ সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল মাহমুদুল্লাহর দল। টস হেরে প্রথমে ব্যাট করে ২০ ওভারে ৩ উইকেটে ২০০ রান করে বাংলাদেশ। ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হওযা সৌম্য অপরাজিত ৬২ ও লিটন ৫৯ রান করেন। জবাবে ১৯ ওভারে ১৫২ রানে অলআউট হয় জিম্বাবুয়ে।

মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস জিতে প্রথমে বাংলাদেশকে ব্যাটিংএর আমন্ত্রন জানান জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক সিন উইলিয়ামস।

ব্যাট হাতে নেমে আজও ঝড় তোলেন বাংলাদেশের দুই ওপেনার তামিম ইকবাল ও লিটন দাস। সিলেটে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে ২৪৫ বলে ২৯২ রানের রেকর্ড জুটি গড়েছিলেন তামিম-লিটন। সিলেটের সেই আবহটা যেন মিরপুরে টেনে নিয়ে আসেন তারা।

প্রথম ওভারে জিম্বাবুয়ের স্পিনার সিকান্দার রাজাকে একটি করে চার-ছক্কা মারেন লিটন। পরের ওভারের প্রথম বলে নিজের প্রথম বাউন্ডারিটি মারেন তামিম। এতে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় তামিম-লিটনের। তাই পাওয়ার প্লের শেষ ওভারে বাংলাদেশের স্কোর হাফ-সেঞ্চুরি স্পর্শ করেন। আর পাওয়া প্লে শেষে ৫৯ রানে পৌঁছায় বাংলাদেশের রান।

পাওয়ার প্লে শেষ হবার পরও মারমুখী মেজাজে ছিলেন তামিম-লিটন। অবলীলায় রান তুলেছেন তারা। ১০ ওভার শেষে দলের স্কোর ৯১তে পৌঁছায়। তবে তখন দু’জনের কেউই হাফ-সেঞ্চুরিতে পৌছাতে পারেননি। কিন্তু ততক্ষনে বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম উইকেট জুটিতে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়ে ফেলেন তামিম-লিটন।

১১তম ওভারের দ্বিতীয় বলে তামিম-লিটনকে বিচ্ছিন্ন করেন জিম্বাবুয়ের স্পিনার ওয়েসলি মাধভেরে। উইকেট ছেড়ে মারতে গিয়ে বল আকাশে তুলে দেন তামিম। এক্সট্রা কভারে তামিমের ক্যাচ নেন জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক উইলিয়ামস। ৯২ রানে থামে বাংলাদেশের প্রথম উইকেট জুটি। ফলে বাংলাদেশের পক্ষে টি-২০ ক্রিকেটে উদ্বোধনী জুটিতে নিজেদের রেকর্ড ভেঙ্গে নয়া রেকর্ড গড়েন তামিম-লিটন।

অবশ্য বাংলাদেশের পক্ষে উদ্বোধনী জুটিতে আগের সর্বোচ্চ রান ছিলো তামিম-লিটনেরই। ২০১৮ সালে কলম্বোর আর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে শ্রীলংকার বিপক্ষে উদ্বোধনী জুটিতে মাত্র ৩৫ বল খেলে ৭৪ রান করেছিলেন তামিম-লিটন।

তামিম ফিরে যাবার ওভারেই টি-২০ ক্যারিয়ারে তৃতীয় হাফ-সেঞ্চুরি তুলে নেন ইনফর্ম লিটন। ৩১ বলে হাফ-সেঞ্চুরির পর, অবশ্য নিজের ইনিংসটি বড় করতে পারেননি শেষ ওয়ানডেতে ১৭৬ রান করা লিটন। রাজার ঘুর্ণিতে লেগ বিফোর হওয়ার আগে ৩৯ বল খেলে ৫টি চার ও ৩টি ছক্কায় ৫৯ রান করেন লিটন।

দলীয় ১০৬ রানে লিটন ফিরলে ক্রিজে জুটি বাঁধেন সৌম্য সরকার ও মুশফিকুর রহিম। শুরু থেকেই মারমুখী মেজাজ দেখান তারা। তাই দলের স্কোর দেড়শ কাছেই পৌঁছে যায়। ২টি ছক্কায় দারুন শুরু করেছিলেন মুশফিক। শেষ পর্যন্ত দলীয় ১৪৬ রানে জিম্বাবুয়ের পেসার ক্রিস এমপফুর বলে আউট হন তিনি। ৮ বলে ১৭ রান করেন মুশফিক। তখন ইনিংসের ২৫ বল বাকী ছিলো।

মুশফিক ফিরলে রানের চাকা দ্রুত ঘুড়িয়েছেন সৌম্য। তাকে স্ট্রাইক দিতে মনোযোগি ছিলেন অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। জিম্বাবুয়ের পেসার ডোনাল্ড তিরিপানোর করা ইনিংসের ১৭তম ওভারে ১৬ রান তুলেন সৌম্য ও মাহমুদুল্লাহ। এরমধ্যে ১টি করে চার-ছক্কা মারেন সৌম্য। পরের দু’ওভারে যথাক্রমে- ৭ ও ১০ রান তুলেন তারা।

শেষ ওভারের প্রথম বলে ছক্কা মেরে হাফ-সেঞ্চুরির দোড়গোড়ায় পৌঁছান সৌম্য। আর তৃতীয় বলে ১ রান নিয়ে ৪৯ ম্যাচের ক্যারিয়ারে দ্বিতীয় হাফ-সেঞ্চুরি তুলে নেন তিনি। তার প্রথম হাফ-সেঞ্চুরিটি ছিলো ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় শ্রীলংকার বিপক্ষে। এরপর ২১ ইনিংস পর ৩০তম বলে হাফ-সেঞ্চুরির স্বাদ নেন সৌম্য।

এমপফুর করা ঐ ওভারের শেষ দু’বলে দু’টি ছক্কা মেরে বাংলাদেশের স্কোর ২শ রান স্পর্শ করান সৌম্য। ২০ ওভারে ৩ উইকেটে ২০০ রান করে বাংলাদেশ। টি-২০ ক্রিকেটে তৃতীয়বারের মত ২শ রানের স্কোর পেল বাংলাদেশ। আর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এটিই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দলীয় রান ।

সৌম্য ৩২ বলে ৪টি চার ও ৫টি ছক্কায় সংক্ষিপ্ত ভার্সনে নিজের সর্বোচ্চ অপরাজিত ৬২ রান করেন।৯ বলে ১৪ রানে অপরাজিত থাকেন মাহমুদুল্লাহ। জিম্বাবুয়ের রাজা-এমপফু-মাধভেরে ১টি করে উইকেট নেন।

জয়ের জন্য ২০১ রানের বিশাল টার্গেটে খেলতে নেমে দ্বিতীয় ওভারে প্রথম ধাক্কা খায় জিম্বাবুয়ে। ব্রেন্ডন টেইলরকে ১ রানে বিদায় দেন বাংলাদেশের পেসার শফিউল ইসলাম। এরপর দ্রুত আরও দুই উইকেটের পতন ঘটে জিম্বাবুয়ের। মিডল-অর্ডারে ক্রেইগ আরভিন ৮ ও ওয়েসলি মাধভেরে ৪ রানে ফিরেন। আরভিনকে শিকার করেন মুস্তাফিজুর রহমান। মাধভেরে রান আউটে কাটা পড়েন।

সতীর্থরা ব্যর্থ হলেও, রানের চাকা সচল রেখেছিলেন ওপেনার তিনাসি কামুনহুকামবে। তবে দলের প্রয়োজন মেটাতে পারেননি তিনি। স্পিনার আমিনুল ইসলামের প্রথম শিকার হয়ে ২৮ রানে থামেন কামুনহুকামবে। ৪টি চার ও ১টি ছক্কায় ২০ বলে ২৮ রান করেন কামুনহুকামবে। চতুর্থ উইকেটে অধিনায়ক উইলিয়ামসের সাথে ১৭ বলে ৩২ রানের জুটি গড়েছিলেন তিনি।

এরপর জিম্বাবুয়ের মিডল-অর্ডারের রির্ভর যোগ্য তিন ব্যাটসম্যানকে ছোট-ছোট ইনিংসে থামিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের জয়ের পথ তৈরি করেন বোলাররা। উইলিয়ামস ১২ বলে ২০, রাজা ১০, রিচমন্ড মুতুম্বামি ১৩ বলে ২০ ও ডোনাল্ড তিরিপানো ১৩ বলে ২০ রান করেন। ফলে ১৩০ রানে নবম উইকেট হারায় জিম্বাবুয়ে। তাই সময়ের ব্যাপার হয়ে দাড়ায় বাংলাদেশের জয়।

তবে শেষ উইকেটে এমপফুকে নিয়ে ব্যাট হাতে ঝড় তুলে বাংলাদেশের জয়কে দীর্ঘায়িত করেন চার্ল মুম্বা। শেষ পর্যন্ত মুম্বাকে থামান মুস্তাফিজ। তখন জিম্বাবুয়ের রান ১৫২। ১৬ বলে ৩টি চার ও ১টি ছক্কায় ২৫ রান করেন মুম্বা। ২ রানে অপরাজিত থাকেন এমপফু। বাংলাদেশের আমিনুল-মুস্তাফিজ ৩টি করে উইকেট নেন।

আগামী ১১ মার্চ মিরপুরেই হবে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টি-২০ ম্যাচ।

স্কোর কার্ড (টস-জিম্বাবুয়ে) :
বাংলাদেশ ব্যাটিং ইনিংস :
তামিম ইকবাল ক উইলিয়ামস ব মাধভেরে -৪১
লিটন দাস এলবিডব্লু ব রাজা- ৫৯
সৌম্য সরকার অপরাজিত ৬২
মুশফিকুর রহিম ক উইলিয়ামস ব এমপফু -১৭
মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ অপরাজিত- ১৪
অতিরিক্ত (লে বা-২, নো-১, ও-৪)- ৭
মোট (২০ ওভার, ৩ উইকেট) ২০০
উইকেট পতন : ১/৯২ (তামিম), ২/১০৬ (লিটন), ৩/১৪৬ (মুশফিক)।
জিম্বাবুয়ে বোলিং :
সিকান্দার রাজা : ৪-০-৩১-১
চার্ল মুম্বা : ২-০-২৪-০
ডোনাল্ড তিরিপানো : ৪-০-৩৯-০
ক্রিস এমপফু : ৪-০-৫৮-১
ওয়েসলি মাধভেরে : ২-০-১৫-১
সিন উইলিয়ামস : ৪-০-৩১-০

জিম্বাবুয়ে ব্যাটিং ইনিংস :
তিনাসি কামুনহুকামবে ক লিটন ব আমিনুল -২৮
ব্রেন্ডন টেলর ক সৌম্য ব শফিউল- ১
ক্রেইগ আরভিন এলবিডব্লুব ব মুস্তাফিজ -৮
ওয়েসলি মাধভেরে রান আউট (আফিফ/মুশফিক)- ৪
সিন উইলিয়ামস ক সৌম্য ব আমিনুল- ২০
সিকান্দার রাজা ক মুশফিক ব আফিফ- ১০
রিচমন্ড মুতুম্বামি ক লিটন ব মুস্তাফিজ -২০
তিনোতেন্ডা মুতোমবদজি ক মুস্তাফিজ ব আমিনুল- ২
ডোনাল্ড তিরিপানো বোল্ড ব সাইফউদ্দিন- ২০
চার্ল মুম্বা ক লিটন ব মুস্তাফিজ -২৫
ক্রিস এমপফু অপরাজিত -২
অতিরিক্ত (লে বা-১, ও-১১)- ১২
মোট (অলআউট, ১৯ ওভার) -১৫২
উইকেট পতন : ১/১১ (টেইলর), ২/৩০ (আরভিন), ৩/৩৭ (মাধভেরে), ৪/৬৯ (কামুনহুকামবে), ৫/৬৯ (উইলিয়ামস), ৬/৮৩ (রাজা), ৭/১০০ (মুতোমবদজি), ৮/১০৭ (মুতুম্বামি), ৯/১৩০ (তিরিপানো), ১০/১৫২ (মুম্বা)।

বাংলাদেশ বোলিং :
মুস্তাফিজুর রহমান : ৪-০-৩২-৩
শফিউল ইসলাম : ৩-০-১৯-১
মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন : ৩-০-১৯-১
মেহেদি হাসান : ৪-০-২৯-০
আমিনুল ইসলাম : ৩-০-৩৪-৩
আফিফ হোসেন : ২-০-১৮-১

ফল : বাংলাদেশ ৪৮ রানে জয়ী।
ম্যাচ সেরা : সৌম্য সরকার(বাংলাদেশ)।
সিরিজ : দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।

Social Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *